Tuesday, March 6, 2018

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও জীবন যুদ্ধ

ছোটগল্প : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও জীবন যুদ্ধ
লেখনিতে : হিমু

মাহবুব হোসেন টুনটুনির দাদু । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ২২ বছর । পদে তিনি ম‍্যাজিস্টেট ছিলেন । খুবই গুরুগম্ভীর স্বভাবের ব‍্যক্তি। মুখে তার রবীন্দ্রনাথের মতো সাদা দাঁড়ি ।
সদ‍্য বুড়ো মানুষ টি স্ত্রীকে হারিয়েছেন । ঘরে একা থাকেন তিনি । দেয়ালে হেমামালিনির মত সুন্দরী মহিলার সাদাকালো ছবি । সম্ভাবতই এনি টুনটুনির দিদিমা মেহরুন বেগম । তার পাশে আছে মোনালিসা, চি গুয়েভারা, সালমন বলিভর,মাও সে তুন এর ছবি । প্রেম,বিপ্লব ও ধ্বংসকে বৃদ্ধ এক করে ফেলেছেন হয়তো। তাই যে কেউ বুঝে নিবেন তিনি একজন মার্কসবাদী । আছে ঘরে সন্তোষ রেডিও । টি টেবিলের উপর পুরাতন দিনের কোলকি । কোলকির পাশে দোদুল্যমান চেয়ার । কলের গান শোনার যন্ত্র আছে শো কেজের উপর । দেয়ালের গায়ে আছে পাখি শিকারের বন্দুক । রুমের এক কোনায় আছে জাপানি সিডি 80 বাইক ।  মাহবুব সাহেবের হাতে এখনো আছে একটা কেসিও ব্রান্ডের ঘড়ি। পরে আছেন জাপানি টোরে সিটের প‍্যান্ট ও কাশমেরি শাল । চোখে মসে কালারের চশমা, ঘরের বারান্দায় কয়েকটি বনশায় এর চাষ করেছেন । তার বাড়ির সামনে বিস্তৃত মাঠ । তারপর একটি জলাশয়,তারপর বাড়ির প্রাচীর । টুনটুনি থাকে বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর মেলবোর্নে । মেনবোর্নের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ট্রেলিয়া ও বিশ্ব ইতিহাস পড়ান তিনি । নামকরা দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা করতেন প্রারম্ভে । সম্প্রতি টুনটুনি তার কলিক আলভা গোমেজ কে বিয়ে করেছেন । টুনটুনি ও আলভা এখন বাংলাদেশে । তার দাদুর কাছে জানতে এসেছে বিশ্বযুদ্ধকালীন ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ সম্পর্কে । ২০ বছর পর দেশে আসলো সে । তার দাদু একটু বিরক্ত তার প্রতি ।
তিনি তাদেরকে নিয়ে বাড়ির সামনের আমতলায় আর,এফ,এল গার্ডেন চেয়ারে বসে আছেন এক পড়ন্ত বিকালে । দাদু বললেন দেখ টুনটুনি, তুমিতো জানো পল হার্বাল এ জাপান আমেরিকার ঘাটিতে বোমা হামলা করেছিল তার শোধ নিতেই আমেরিকা হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে বোমা হামলা করে যুদ্ধের শেষ ঘটায়ছিল । হিটলার,স্টালিন, যুজভেল্ট,মুসোলিনি, হিরোহিত,চার্চিল এরা ধ্বংস খেলায় মেতেছিল কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষের ক্ষতির কথা কে বা মনে রাখে । আমার ভাই মকসুদ ছিল মেলেটারি তে । ভারতবর্ষের স্বাধীনতার চুক্তি ছিল ,বিশ্বযুদ্ধে মিএ শক্তিকে সাহায্য করলেই ভারতবর্ষ স্বাধীন হবে । সেই চুক্তি অনুযায়ী মিএ শক্তিকে সাহায্য করতে মারা গেল মকসুদ । মিএ সেনাদের খাদ্য যোগাতে এদেশের খাদ‍্যের সিংহভাগ বিদেশে পাঠাতে হয়েছিলো । আমার চোখের সামনে হাজার হাজার মানুষ মরতে দেখিছি । তখন মাথার উপর সারাক্ষণ প্লেন উড়ত । বিশ্ব রাজনীতির পেষনকলে আমরা ছিলাম বন্দি ।
৭৬ এর মনান্তর দিয়ে তারা শুরু করেছিল সম্রাজ‍্যবাদ । নিষ্পেষন শেষে আবার ও উপহার দিয়েছিলো দুর্ভিক্ষ ।

টুনটুনি বললো এখন সবাই কেমন আছে ?
 নির্লপ্ত কন্ঠে দাদু বললেন কেমন থাকবে সবাই ?
তোদের মতো মেধাবীরা তো টাকার কাঙাল হয়ে ব্রেন ড্রেন এর জন্ম দিয়েছিস । দেশের জন‍্য আবিস্কার না করে বিদেশের হয়ে আবিস্কার করছিস। তোরাই তো বড়ই সামান্তবাদী,সম্রাজ্যবাদী । দেশের উপকারে আসলি না । স্কলারশিপ নিয়েই প্রতারণা করলি দেশ ও দশের সাথে । ফিরে আসতে চেয়েও আসলি না ।
দাদুর প্রলাপে দাদুকে পাগল বলে টুনটুনি আবার  গার্ডেন চেয়ার হতে উঠলো । মানসিক রোগের ডাক্তার কে খবর দিলো এবং পরদিন সকালে গোমেজের সাথে বার্বাডোজে গেল । কারন টা খুবই স্বাভাবিক, বিয়ে হয়েছে তাদের কিন্ত হানিমুন হয়নি তাদের । দেশ ছেড়ে চললো টুনটুনি ।

বাংলাদেশে থেকে গেলেন প্রলাপ বকা দাদু ও তার হৃদয়ের গভীরের বেদনা ।

হয়তো কিছুদিন পর গোমেজের সাথে হবে টুনটুনির ছাড়াছাড়ি । এমনকি তার স্থান হতে পারে বৃদ্ধাশ্রম । থাকবে না দাদু । থাকবে শুধু প্রলাপ । হয়তো টুনটুনির নাতনি রা ও শোধ নিবেন, পল হার্বাল এ হামলার শাস্তি স্বরুপ নাগাছাকি কিমবা হিরোসিমা হামলার মত ।



No comments:

Post a Comment