Friday, December 1, 2017

ছোটগল্প : আগ্রহ ও প্রণয় ।

ছোটগল্প : আগ্রহ ও প্রণয় ।
লেখনিতে : হিমু
আমার গল্পের নায়ক অনিকেত আজ বাস ভ্রমনে । দৃষ্টি তার আকাশ ও পৃথিবী যেখানে মিশেছে এমন সীমানায় । দুর্নিবার সেই অপলক দৃষ্টি ।
কি যেন কল্পনার জগত তাকে শিহরিত করছে । রহস‍্যে মোড়ানো সে জগত । সে জগতের সম্ভাব‍্য ঘটনা প্রবাহ একটু আধটু অনুমান করা যায় তবে একজন দর্শর বাহির থেকে অন‍্যের সৃষ্ট সে জগতে প্রকৃতপক্ষে কি ঘটছে, সঠিকভাবে বলতে পারে না । শুধু অনুমান করতে পারে এবং অনুধাবন করতে পারে ।
বাসের হর্ন কিমবা জানালা দিয়ে উড়ে আসা কোন ধুলিকনা তার কল্পনার রাজ‍্যকে এতটুকুন নাড়া দিতে পারছে না । কারন তিনি হয়তো পড়েছেন । অজানা কিছুর প্রেমে । কি সেটা ?
ইদানিং, অরু তার প্রতি ভীষন কেয়ারিং হয়ে উঠেছে । কে জানে,তিনি কি অরুর কথা ভাবছেন ?
অনিকেত আমার সবথেকে কাছের বন্ধু । আমার প্রিয় সঙ্গী । আচমকা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ইচ্ছাকৃতভাবে কাশি দিলাম । ও ঠিকই ধরে নিলো ,আমি পথের দুরত্ব কমাতে সঙ্গীর অনুসঙ্গ চাচ্ছি । আমার দিকে তাকাতেই এবং গল্পের ভিতর ডুব দিতেই একটি ঘটনা ঘটল ।, বাসে ছিট না পেয়ে দাড়িয়ে থাকা একটা মধ্যবয়স্ক মহিলা একটা দাড়িয়ে থাকা পুরুষের গালে সজোরে চপ্পট মারলো। হট্টগোল টা ছিল বোধহয়,অবলা নারীকে হেনস্থা করার দরুন ।
আজ নারীর বিপ্লবী মুর্তি দেখে প্রিতীলতা কিমবা বেগম রোকেয়ারা ভীষণ খুসি হতেন হয়তো ।
আমার গল্পের নায়কের তাতে কিছু আসে যায় না কারন তিনি ভালবাসতে পছন্দ করেন,ভালবেসে অন‍্যের হৃদয় ভাঙতেও পছন্দ করেন । এটাই তার কাছে শিল্প । তার বিশ্বাস ,শিল্পীর সাফল্য কেবলমাএ নির্ভর করে অন‍্যের মনে দাগ কাটতে পারাতেই।
তাই আমার গল্পের নায়ক ভালোবাসা দিয়ে মানব মনে জোয়ারের সৃষ্টি করেন । আবার ভালোবাসাহীন ভাটা দিয়েই সূক্ষ্মভাবে জায়গা করে নেন অন‍্যের হৃদয়ের মরুভূমি সম খাঁ খাঁ বালুময় নিস্তব্ধ প্রান্তরে।
মনরাজ‍্যের রঙ্গরসে তিনি ভাসতে ভালবাসেন না । শুধু অন‍্যকে ভাসান ।
রোমান্টিকতা তার নিত‍্য সঙ্গী আর অপ্রতিরোধ্য অস্ত্র । হয়তো সেই অস্ত্রের নির্মম আঘাতে সকল নারী হৃদয় বিদ্ধ হতে বাধ‍্য ।
তাই মানুষের মন জয় করে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা তার বাম হাতের খেল ।
এটা সত‍্য যে ,জোর করে কোন অবলাকে স্পর্শ করলে আপনি চপ্পলের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন,ঠিক ভালবেসে একই স্পর্শ অনুপম ভালোবাসার জন্ম দিবে।

কেননা নারী হৃদয় বড় বিচিত্র ,বড় কোমল আবার নির্মম ও বটে । যাই হোক,আমি দর্শক,দর্শকের অযথা বকবকের থেকে ,অনিকেতের কর্মকান্ড তার ভক্তরা বেশি জানতে চাইবেন হয়তো ।।
অরুর সাথে অনিকেতেল প্রায়ই দেখা হয় । সে অনিকেতের জন‍্য নবান্নের নতুন ধানের পায়েশ রান্না করেছে বাস ভ্রমন শুরুর আগে । অরু অনিকেতের টিফিন বাস্কে পায়েশ,তিনটা রুটি ও পাঁচটা নাড়ু পাঠিয়েছে । আমি তার সঙ্গী হওয়ায় তাতে ভাগ বসালাম নিসঙ্কচে ।
খাইতে খাইতে আমার মনে হলো, মেয়েরা প্রিয় ছেলেদের নিজের হাতের রান্না খাবার খাওয়ায়ে ভালোবাসার প্রথম অনুভূতি অলিখিত ভাবে প্রকাশ করেন । আর সে অনুভূতির মায়াজাল কোন পুরুষের জন্য ছিন্ন করা কঠিন হয় যদি না আপনার হৃদয় প্রস্তর সম হয় ।
আমি ভাবলাম,অনিকেত এবার বুঝি মায়ার জালে আবদ্ধ হতে চললো । হয়তো ইতোমধ্যে তার বুকের ডানপাশে টান টান অনুভূতির সৃষ্টি হচ্ছে ।
আবার ভাবলাম,আমার মত অনিকেত তো অতবেশি আবেগি না ,তাই তার হৃদয় গলেছে কি কে জানে ?
সকাল হতে দুপুর অনিকেত রহমান এর সাথে আমার নিরস ভ্রমন চলছে । কারো সাথে করো কোন খোশগল্প নেই । দুর থেকে হয়তো কেউ ভাবতো আমরা দুই ভিন্ন গ্রহচারী ।
স্বভাবতই আমি বাচাল আর আমার গল্পের নায়ক নীরব ঘাতক কার্বন-মনোঅক্সাইড ।
বাসের ভিতর লেখা আছে,এখানে ধূমপান নিষেধ । তবুও একটা সিগারেট তার ধরানো লাগবে । কিছুটা নিকোটিন এর স্পর্শ তার ফুসফুস ,ধমনী, শিরা,উপশিরা কিমবা রক্তবিন্দুতে মেশানো লাগবে । ধূমপায়ী মানুষের কাছে সিগারেটের একটানের মূল্য হেরা যহরতের থেকেও দামি । লেখক হয়ে কোন চরিত্রকে শাসন করা যায় না তাই প্রতিবারের ন‍্যায় নির্বাক দর্শক আমি ।
আমি জানি, অনিকেত ছেলেটা ধূমপায়ী, অনেকের চোখে অসভ্য তবুও তাকে আমার ভাললাগে । কারন কিছু মানুষের মায়ার বন্ধন উপেক্ষা করা কঠিন । একথা সত‍্য,প্রত‍্যেক মানুষ তার বিপরীতধর্মী মানুষের অনুসঙ্গ উপভোগ করে । হোক সে ছেলে বা মেয়ে। হয়তো প্রত‍্যেক বস্তু তার সমধর্মী বস্তুকে বিকর্ষণ করে ও বিপরীত ধর্মী বস্তুকে আকর্ষন করে বলে এমনটি ঘটে ।
বোধহয় তার প্রতি আমার সেকারনেই মায়া ।
আমি বাঙালি সমাজব‍্যবস্থায় গে হতে না চাইলেও এই ছেলেটার প্রেমে পড়েছি । এটা সাংসারিক প্রেম নয়,বন্ধুত্বের প্রেম ।
কোন মেয়ে আমাকে যতটা না আকর্ষন করে এই ছেলেটার সহচর্য আমার তার থেকে বেশি প্রিয় । তাই অরুর প্রতি আমার হিংসা বেশি কারন অনিকেত যদি অরুকে সময় দেয় আমি তার নির্মল অনুসঙ্গ টা পায় না ।
তবুও বন্ধু হিসেবে চাই,অনিকেত সত্যি কারোর প্রেমে পড়ুক ।
আমি জানি,অনিকেত অরুর প্রেমে পড়েনি,শুধু মন ভাঙার খেলা খেলছে ।
যাইহোক,
উক্ত সিগারেটের সাদা ধুয়া তার চোখের চশমার সাদা গ্লাসে জমছে । আমি বললাম দেখতে অসুবিধা হচ্ছে না তোমার ?
স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সে বললো,যেটা দেখতে আমাদের কষ্ট বেশি,তার প্রতি আমাদের আকর্ষণ ও মোহ দুইটায় বেশি ।
দেখ লেখক,তুমি হচ্ছ ঘটনায় চামচা,আমি যা বলবো তুমি তাই লিখবা,আমি জানি,তুবুও আমার ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপারগুলোর কেন বলি জানো ?
আমি শুধু হাসি দিয়ে বললেম :কেন অনিকেত রহমান~?
অনিকেত রহমান বলল: তোমার কিউরিসিটি কে ইচ্ছাকৃত ভাবে নাড়া দেয় যাতে তুমি আমার মায়ায় পড়ো । আর মায়া এমন একটা জিনিস যা কারোর পক্ষে ভেদ করতে পারা কঠিন । মায়ার বন্ধনে বেধে মানুষকে প্রতিনিয়ত জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে ঘুরানো যায় ।
শুলে চড়ানো যায় । ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো যায় কিন্তু মরন আসে না ।
তোমার কি লাভ এসব করে অনিকেত,নিস্পলক তাকিয়ে আমার প্রশ্নবানে জর্জরিত করার চেষ্টা করলেম তাকে ?
মৃদু হেসে,খেলায় তো জীবনের অংশ,যখন আমরা ক্রিকেট মাঠে প্রিয় দলকে ১ বলে ১ রান করার মত অবস্থায় দেখি বুকের মধ‍্যখানে আমরা তীক্ষ্ণ টান অনুভব করি । এ টান ততক্ষন থাকে যতক্ষন না একটা বল না হয় । মূলত আমরা কিউরিসিটির জালে আবদ্ধ ।
এই বলে নির্দিষ্ট গন্তব্য আসার আগে অনিকেত বাস থেকে নেমে পড়লো ।
আমি ডাকলাম । আমার ডাক তার কর্নকুহর পৌচ্ছাছালো না ।
কিউরিসিটি নিয়ে আমি নিস্পলক তাকিয়ে থাকলাম ও একটু হেসে ভাবলাম ,আসলেই তার কথাটা সত‍্য।
বোধহয় সে মানুষের মাঝে আগ্রহের জন্ম দিতে পারে বলেই মানুষ তাকে ভালবাসে,তার খেলার পাত্র হতে ভালবাসে । অবশেষে ভালবাসা আর না ভালোবাসা পেন্ডুলামের মত দুলতে থাকে ।
গভীর ভালোবাসা কখনো কাছে টানে অথবা কখনো দুরে ঠেলে দেয় । অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাস অবিশ্বাস পরস্পরকে দুরে ঠেলে দেয় । কিউরিসিটি অথবা হাজার অব‍্যক্ত কথা মানুষের আশার বীজকে বাচিয়ে রাখে । অদম্য সেই হাতছানি মানুষ কে বার বার রঙ্গ রসে ডুবায় । প্রেম বারবার আসে ভিন্নরূপে । নতুন অবয়বে । নতুন বাতাবরণে,নতুন আগ্রহের জন্ম দিয়ে ।


No comments:

Post a Comment